Monday, December 15, 2025

​🇧🇩 ১৬ই ডিসেম্বর: মহান বিজয় দিবস - এক গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী।


 ১. ভূমিকা: যে দিনটি জন্ম দিয়েছিল একটি জাতির 

​প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর তারিখটি বাঙালি জাতির জীবনে নিয়ে আসে এক অনির্বচনীয় আবেগ ও গৌরব। এই দিনটি আমাদের মহান বিজয় দিবস। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের (Bangladesh) জন্ম হয়েছিল। এই বিজয় কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তি ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ। এই নিবন্ধে আমরা ১৬ই ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এর তাৎপর্য এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

​১.১. বিজয় দিবসের সংজ্ঞা 

​বিজয় দিবস হলো সেই ঐতিহাসিক দিন, যেদিন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এই দিনটি আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং লাখো শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

​২. ঐতিহাসিক পটভূমি: যে রক্তক্ষয়ী পথ ধরে এসেছিল স্বাধীনতা 

​বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে, যা ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদে রূপ নেয়। কিন্তু চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৭১ সালে।

  • ​২৫শে মার্চের গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা শুরু করে। নিরীহ মানুষের ওপর অতর্কিত আক্রমণ আমাদের জাতিকে সশস্ত্র প্রতিরোধে যেতে বাধ্য করে।

  • বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার ঘোষণা: এই আক্রমণের ঠিক আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (Sheikh Mujibur Rahman) স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণটি (এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম) ছিল বাঙালি জাতির জন্য অনুপ্রেরণার মূল উৎস।

  • মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা: বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে (Mukthijuddho)। দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে এই সশস্ত্র সংগ্রাম।

​২.১. নয় মাসের সংগ্রাম ও মিত্র বাহিনী 

​পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত 'মিত্র বাহিনী' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণ পাকিস্তানি বাহিনীকে দ্রুত কোণঠাসা করে ফেলে।

​৩. ১৬ই ডিসেম্বর: আত্মসমর্পণের দলিল ও জাতির জন্ম 

​১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিক থেকেই পাক-বাহিনী আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। অবরুদ্ধ ঢাকা মুক্ত করার জন্য মিত্র বাহিনীর আক্রমণের মুখে অবশেষে আসে সেই চূড়ান্ত ক্ষণ।

​১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর (December 16) বিকেলে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

💡 ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দুপুর ৪টা ৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর হওয়ার মাধ্যমে পরাধীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের অবসান ঘটে এবং জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

​৩.১. বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় 

​এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে একটি নতুন ও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এটি ছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অর্জন।

​৪. বিজয় দিবসের গুরুত্ব ও আজকের বাংলাদেশ 

​বিজয় দিবস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি আলোকবর্তিকা।

  • জাতীয় চেতনা বিজয় দিবস উদযাপন মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও দেশের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি।

  • শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জাতীয় স্মৃতিসৌধ সাভার লাখো শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

  • জাতীয় আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা।

৪.১. কীভাবে বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়? 

​প্রতি বছর এই দিনে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সারা দেশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং নানা আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে উদ্বুদ্ধ করে।

​৫. উপসংহার: আমাদের অঙ্গীকার 

​১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কত চড়া। আমাদের অঙ্গীকার হোক – মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী ও উন্নত 'সোনার বাংলা' (Sonar Bangla) গড়ে তোলা, যেখানে সকল নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

No comments:

Post a Comment